পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে ‘ঐকশ্রী’ (Aikyashree) স্কলারশিপ চালু করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম (WBMDFC – West Bengal Minorities Development and Finance Corporation)-এর মাধ্যমে পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো স্কুলস্তর থেকে শুরু করে কারিগরি ও পেশাদার পাঠ্যক্রম পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে ।

What is the Aikyashree Scholarship?
রাজ্যের মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন এবং পার্সি সম্প্রদায়ের মেধাবী অথচ আর্থিক অনটনে থাকা শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহায়তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার পূর্বের বিভিন্ন সংখ্যালঘু Scholarship প্রকল্পকে একত্রিত করে ২০১৯ সালে ‘ঐকশ্রী’ পোর্টাল চালু করে। এটি প্রাক-মাধ্যমিক (Pre-Matric) থেকে শুরু করে পিএইচডি ও পেশাদার ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনুদান পৌঁছে দেয়।
Aikyashree প্রকল্পের আওতাধীন Scholarship প্রকারভেদ
| প্রকল্পের নাম | শ্রেণি / শিক্ষাস্তর | মূল উদ্দেশ্য |
| Pre-Matric Scholarship | ৯ম থেকে ১০ম শ্রেণি | স্কুলছুটের সংখ্যা কমানো ও প্রাথমিক শিক্ষায় সহায়তা |
| Post-Matric Scholarship | একাদশ শ্রেণি থেকে পিএইচডি | উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও গবেষণায় সহায়তা |
| Merit-cum-Means (MCM) | কারিগরি ও পেশাদার কোর্স (B.Tech, MBBS, MBA ইত্যাদি) | উচ্চ ব্যয়ের পেশাদার কোর্সে মেধার ভিত্তিতে সাহায্য |
| Talent Support Stipend (TSP) | একাদশ থেকে পিএইচডি (৫০% এর কম নম্বর প্রাপ্তদের জন্য) | কম নম্বর প্রাপ্ত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা জারি রাখা |
| Swami Vivekananda Merit-cum-Means (SVMCM) | উচ্চ মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা (ন্যূনতম ৬০% নম্বর) | অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় বড় অঙ্কের বৃত্তি |
আবেদনের যোগ্যতা ও শর্তাবলী
বিভিন্ন ক্যাটাগরির জন্য যোগ্যতার মাপকাঠিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে, তবে সাধারণ মূল শর্তগুলি নিম্নরূপ:
- বাসস্থান: শিক্ষার্থীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- ধর্মীয় পরিচয়: আবেদনকারীকে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে (মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন বা পার্সি)।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: শিক্ষার্থীকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্বীকৃত অথবা সমপর্যায়ের কোনো অনুমোদিত স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পাঠরত হতে হবে।
- নম্বরের মাপকাঠি:
- প্রাক ও উত্তর মাধ্যমিকের জন্য পূর্ববর্তী চূড়ান্ত পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০% নম্বর প্রয়োজন।
- স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস (SVMCM)-এর জন্য ন্যূনতম ৬০% নম্বর বাধ্যতামূলক।
- ট্যালেন্ট সাপোর্ট স্টাইপেন্ড (TSP)-এর ক্ষেত্রে ৫০% এর নিচে প্রাপ্ত নম্বরধারীরা আবেদন করতে পারেন।
- পারিবারিক বার্ষিক আয়:
- Pre-Matric, Post-Matric ও TSP: পারিবারিক বার্ষিক আয় ২ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে হবে।
- Merit-cum-Means (MCM): পারিবারিক বার্ষিক আয় ২.৫০ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে হবে।
- SVMCM: পারিবারিক বার্ষিক আয় ২.৫০ লক্ষ টাকার কম হতে হবে।
- অন্যান্য শর্ত: একই শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের অন্য কোনো সরকারি স্কলারশিপ গ্রহণ করতে পারবে না।
স্কলারশিপের পরিমাণ ও আর্থিক সহায়তা
ঐকশ্রী স্কলারশিপের অধীনে কোর্স এবং আবাসন ব্যবস্থার (Hosteller বা Day Scholar) ওপর ভিত্তি করে আর্থিক সহায়তা নির্ধারিত হয়:
- Pre-Matric: শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ১,১০০ টাকা থেকে শুরু করে শ্রেণির স্তর অনুযায়ী প্রায় ১১,০০০ টাকা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ অনুদান (Maintenance Allowance) ও অ্যাডমিশন ফি দেওয়া হয়।
- Post-Matric: একাদশ, দ্বাদশ, সাধারণ ডিগ্রি এবং ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য বার্ষিক প্রায় ২,৭৫০ টাকা থেকে ১৬,৫০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা মেলে।
- Merit-cum-Means (MCM): ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও ম্যানেজমেন্টের মতো পেশাদার কোর্সের ক্ষেত্রে বার্ষিক ২০,০০০ টাকা থেকে ৩৩,০০০ টাকা পর্যন্ত সহায়তা প্রদান করা হয়। তালিকাভুক্ত অগ্রণী প্রতিষ্ঠানগুলিতে (Listed Premier Institutions যেমন IIT, IIM) প্রকৃত কোর্স ফি সম্পূর্ণ মকুব বা অনুদান হিসেবে মেলে।
- SVMCM (Minority): কোর্স ভেদে মাসে ১,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত (বার্ষিক ১২,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা) প্রদান করা হয়।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র (Required Documents)
অনলাইনে আবেদনের সময় নিম্নলিখিত নথিগুলি আপলোড করতে হয় অথবা তথ্যের নির্ভুল যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন হয়:
- পূর্ববর্তী যোগ্যতামান পরীক্ষার মার্কশিট (Marksheet of last qualifying exam)
- পারিবারিক আয়ের প্রমাণপত্র (Income Certificate — পঞ্চায়েত প্রধান, মিউনিসিপ্যালিটি চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা গ্যাজেটেড অফিসার দ্বারা প্রদত্ত)
- আবেদনকারীর নিজস্ব সক্রিয় ব্যাংক পাসবুকের প্রথম পাতা (যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর, নাম ও IFSC স্পষ্ট থাকে)
- আধার কার্ড বা বৈধ পরিচয়পত্র
- বর্তমান শিক্ষাবর্ষে ভর্তির রসিদ বা ফি বুক (Fee Receipt / Admission Challan)
- বাসস্থানের প্রমাণপত্র (Domicile Certificate / Ration Card / Aadhaar)
- পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি
- প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তৃক প্রদত্ত ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন ফর্ম (প্রয়োজনে)
ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদন পদ্ধতি (Application Process)
ক. নতুন আবেদনকারীদের জন্য (Fresh Application)
- ওয়েবসাইটে প্রবেশ: প্রথমে অফিসিয়াল পোর্টাল nspwb.wbmdfc.org-এ যান।
- Student Registration: Student Area-তে ক্লিক করে Fresh Application-এ যান এবং নিজের জেলা নির্বাচন করুন।
- তথ্য পূরণ: নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, ধর্ম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
- লগ-ইন ও তথ্য প্রদান: প্রাপ্ত ইউজার আইডি (User ID) ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ-ইন করে শিক্ষাগত বিবরণ ও ব্যাংকের বিস্তারিত তথ্য লিখুন।
- নথি আপলোড: প্রয়োজনীয় মার্কশিট, আয়ের সনদ এবং ব্যাংক পাসবুক স্ক্যান করে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী আপলোড করুন।
- চূড়ান্ত সাবমিশন: সমস্ত তথ্য মিলিয়ে দেখে Submit & Lock Application করুন। এরপর জেনারেট হওয়া আবেদনপত্রের প্রিন্টআউট ও সমস্ত নথির জেরক্স কপি সংশ্লিষ্ট স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিন।
খ. পুনর্নবীকরণ বা রিনিউয়াল আবেদন (Renewal Application)
- যারা আগের বছর Scholarship পেয়েছেন, তারা Renewal Application-এ যাবেন।
- পূর্ববর্তী অ্যাপ্লিকেশন আইডি ও জন্মতারিখ দিয়ে লগ-ইন করতে হবে।
- বর্তমান শ্রেণির ভর্তির বিবরণ এবং শেষ পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর পূরণ করে নথি আপলোড করলেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
আবেদনের স্ট্যাটাস যাচাই (Track Application)
- পোর্টালের হোমপেজে থাকা Track Application অপশনে ক্লিক করুন।
- সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন করুন।
- Application ID জন্মতারিখ এবং ক্যাপচা কোড লিখে Submit করুন।
- স্ক্রিনে দেখা যাবে আবেদনটি ইনস্টিটিউট লেভেল, ডিস্ট্রিক্ট লেভেল নাকি স্টেট লেভেলে অনুমোদিত হয়েছে।
সাধারণ ভুলভ্রান্তি ও সমাধান
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ: ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি যেন অবশ্যই আবেদনকারীর নিজের নামে হয় এবং আধার লিঙ্ক করা থাকে (Bank Seeded)। কোনো জয়েন্ট বা বন্ধ হয়ে যাওয়া অ্যাকাউন্ট দেওয়া যাবে না।
- IFSC কোড পরিবর্তন: ব্যাংক সংযুক্তিকরণের (Merger) কারণে অনেক ব্যাংকের IFSC কোড পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান সঠিক কোডটি উল্লেখ করা জরুরি।
- ভুল তথ্য ও রিজেকশন: আয়ের পরিমাণ বা প্রাপ্ত নম্বরের তথ্যে গরমিল থাকলে আবেদনপত্র বাতিল হয়ে যেতে পারে।
যোগাযোগের মাধ্যম ও হেল্পলাইন
আবেদন সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হলে বা পেমেন্ট সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে নিচের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যায়:
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট:
wbmdfc.org - টোল ফ্রি হেল্পলাইন নম্বর: ১৮০০-১২০-২৩৪৫ (1800 120 2345)
- টেকনিক্যাল সাপোর্ট ইমেল:
helpdesk.wbmdfc@gmail.com
ঐকশ্রী প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সংখ্যালঘু পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের ড্রপ-আউট কমিয়ে তাদের মূলস্রোতের উচ্চশিক্ষার সাথে যুক্ত রাখতে এক অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ। সঠিক নথিপত্রসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করলে সহজেই এই প্রকল্পের সুফল পাওয়া সম্ভব।